শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৬:০০
ইরাককে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার অধীন করা যাবে না, ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে: বাগদাদের জুমার খতিব

হাওজা নিউজ এজেন্সি— ইরাককে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা ও প্রভাবের অধীন করা যাবে না এবং দেশের শক্তি, কর্তৃত্ব ও জাতীয় মর্যাদা সুদৃঢ় করতে ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাগদাদের জুমার নামাজের খতিব ও নাজাফ হাওজার বিশিষ্ট আলেম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ ইয়াসিন আল-মুসাভি। একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘের কার্যকারিতা, ইরাকের ওপর মার্কিন প্রভাব এবং দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার যেকোনো প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবারের জুমার খুতবায় আয়াতুল্লাহ আল-মুসাভি বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধ ও আগ্রাসন প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ গত কয়েক দশকে এসব লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতার একটি বড় অংশ হারিয়েছে।

তিনি বলেন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নেওয়া এবং যুদ্ধ ও দখলদারিত্ব প্রতিরোধে জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা একমেরুকেন্দ্রিক হয়ে ওঠার পর এ ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আয়াতুল্লাহ আল-মুসাভির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং যুদ্ধ উসকে দেওয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটন নতুন রূপে ঔপনিবেশিক পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এসব কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় জাতিসংঘের অক্ষমতারও সমালোচনা করেন তিনি।

সাম্প্রতিক জাতিসংঘের বৈঠকগুলোতে কয়েকটি আরব ও ইসলামি দেশের অবস্থানকে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যায়িত করে আয়াতুল্লাহ আল-মুসাভি বলেন, অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ যখন হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি, তখন এসব দেশের কর্মকর্তাদের মার্কিন কর্মকর্তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও সহযোগিতা তাদের জাতীয় মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “ইরাককে এমনভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে হাজির হওয়া উচিত নয়, যাতে আত্মসমর্পণ বা অপমানের চিত্র ফুটে ওঠে।”

খুতবার অন্য অংশে আয়াতুল্লাহ আল-মুসাভি ইরাক ও দেশটির জাতীয় শক্তিগুলোকে দুর্বল করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ইরাকের উচিত এমন শক্তিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক জোরদার করা, যারা দেশটির শক্তি, কর্তৃত্ব ও মর্যাদা সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখে।

এ প্রসঙ্গে তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ‘ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর’ বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে।

ইরান থেকে ইরাকে আসা কয়েকটি ফ্লাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন বাগদাদের জুমার খতিব। তিনি বলেন, এসব ফ্লাইটের যাত্রীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাজার জিয়ারতে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষ।

আয়াতুল্লাহ আল-মুসাভি জানান, তিনি এ বিষয়ে ইরাক ও ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে এসব ফ্লাইট বন্ধের পক্ষে যেসব কথিত হুমকি বা নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখানো হয়েছে, সে বিষয়ে তাকে দেওয়া তথ্য এসব পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রমাণে যথেষ্ট ছিল না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অস্ত্রের বিষয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন আয়াতুল্লাহ আল-মুসাভি। তিনি বলেন, সামরিক শক্তি রাষ্ট্রের কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী গঠনের পক্ষে তিনি নন।

তবে তিনি একই সঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা শক্তিগুলোকে দুর্বল করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। একইভাবে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের নামে ইরাকের ওপর মার্কিন প্রভাব প্রতিষ্ঠার সুযোগও দেওয়া উচিত নয়।

নাজাফের হাওজায়ে ইলমিয়ার এই বিশিষ্ট আলেম লেবাননের প্রতিরোধ এবং ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, এসব শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ‘ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর’ বিরুদ্ধে আঞ্চলিক শক্তি ও প্রতিরোধক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

তিনি শহীদ আয়াতুল্লাহ ইমাম সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর ভূমিকাও প্রশংসা করেন এবং বলেন, তিনি এমন একটি আঞ্চলিক শক্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম।

ইরাকের জনগণকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে উল্লেখ করে বাগদাদের জুমার খতিব বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাজার জিয়ারতে মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং প্রতিরোধের কমান্ডারদের জানাজায় বিপুল জনসমাগম ইরাকি জনগণের মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি অঙ্গীকারের প্রমাণ। একই সঙ্গে এটি যেকোনো ধরনের আত্মসমর্পণ বা নতি স্বীকারের প্রতি তাদের প্রত্যাখ্যানের বহিঃপ্রকাশ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

খুতবায় আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ ইয়াসিন আল-মুসাভি ইরাকের রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর প্রতি, বিশেষ করে কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্কের প্রতি, দেশের মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

তিনি রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

সূত্র: এভা প্রেস (AVA Press)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha